কানে তুলো, পিঠে কুলো শুধু নৈতিক চাপ নয়, দরকার নিষেধাজ্ঞাও
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমনের পালা শেষই হচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাখাইন রোহিঙ্গাশূন্য না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই ঢল থামবে না। ইতিমধ্যেই রাখাইনের ২৫টির মতো গ্রাম রোহিঙ্গাশূন্য ঘোষিত হয়েছে। সোমবার একদিনেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে সীমান্ত অতিক্রম করে। বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করা মাত্রই ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুবরণ করেছে দুই শিশু। উখিয়ার পালংখালীর নাফ নদীর তীরে আশ্রয় নেয়া এই দফায় আগত রোহিঙ্গারা নিপতিত হয়েছেন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায়।
একটা বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আন্তর্জাতিক মহল মিয়ানমার সরকারের ওপর যে নৈতিক চাপ দিয়ে আসছে, তারা সেই চাপ অনুভব করছে না। গত ৪৫ দিনে জাতিসংঘ ও এর নিরাপত্তা পরিষদ থেকে শুরু করে পৃথিবীর অনেক দেশ ও সংস্থা রোহিঙ্গা নিপীড়নে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার দাবিও উঠেছে এবং সেই দাবি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার যেন কানে দিয়েছে তুলো, পিঠে বেঁধেছে কুলো। যেখানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা, সেখানে উল্টো তারা অব্যাহতভাবে নিপীড়নমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে এবং এতে রাখাইনের অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা ধাপে ধাপে চলে আসছেন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, তবে কি মিয়ানমার সরকার পুরো রাখাইন রাজ্যটিকেই রোহিঙ্গাশূন্য করতে চাইছে? এ এক সীমাহীন রাষ্ট্রীয় ঔদ্ধত্য। বর্তমান বিশ্ব সব ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যখন ঐক্যবদ্ধ, তখন রাষ্ট্র নিজেই সন্ত্রাসীর ভূমিকায় নেমেছে মিয়ানমারে। মিয়ানমার সরকারের এই অনৈতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সমগ্র বিশ্বকে শুধু ঐক্যবদ্ধ হলেই চলবে না, এই সরকারের মানবতাবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে নিতে হবে শক্ত অবস্থান।
বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে ঐকমত্যও হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঢল যেহেতু থামছে না, তাই বোঝাই যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার সমস্যা সমাধানে আন্তরিক নয়। তাদের আচরণ ছেলেভোলানো চালাকি ছাড়া অন্য কিছু মনে হচ্ছে না। বস্তুত বর্তমান পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা ছাড়া বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। দেশটিতে বিনিয়োগ বন্ধ করার ঘোষণাও দিতে পারে ইইউ। এ ব্যাপারে খসড়া প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা মনে করি, শুধু যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, অন্যান্য বৃহৎ শক্তিসহ বিশ্বের সব রাষ্ট্রের উচিত হবে মিয়ানমারকে চাপের মুখে রাখা, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। শুধু কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে বলে মনে হয় না।

Comments
Post a Comment